Thursday, 4 August 2016

মানুষ হত্যা নয়: ইসলাম শান্তির ধর্ম

.............. মাওলানা মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ
মানুষ খুন ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম ইসলাম ধর্মে এর স্থান নেই। ইসলাম শান্তির ধর্ম, সাম্যের ধর্ম। যারা মানুষ হত্যা করে, সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত থাকে ইসলাম তাদেরকে ধিক্কার জানায়। শান্তি ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে জাতি ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সমাজের সকল মানুষের সহবস্থান জানমাল ও ইজ্জত আবরুর নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করুক এটা কোরআন-হাদীসের ঘোষণা। এ কথা দিবালোকের ন্যায় সত্য যে, ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি—, শৃঙ্খলা এবং মানুষের জান-মালের স্থায়ী নিরাপত্তার জন্যে কুরআন-হাদীসের আলোকে জীবনাদর্শের বাস্তবায়ন ও অনুকরণের বিকল্প নেই।
কোরআন-হাদীসের বাস্তব প্রতিচ্ছবি হচ্ছেন, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)। তাই মহানবীর (সাঃ) এর দেখানো মহান আদর্শ অনুস্বরণ করলে এ সমাজে খুন-সন্ত্রাসী চিনতাই কোন অবস্থায় সৃষ্টি হবেনা। কুরআন-হাদিস থেকে দূরে অবস্থান করার কারণে আজকের অশান্তিও পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।
এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-
অনুবাদ: আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করবে অবশ্যই তারা প্রকাশ্য ভ্রষ্টতায় পতিত হবে। (আল আহজাব, আয়াত ঃ ৩৬)
বর্তমান সময়ে ইসলামের নামে কতিপয় ইসলাম নামধারী মানুষ খুন-হত্যা,সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন। যা কুরআন-হাদীসে এর কোন ভিত্তি নেই। মানুষ হত্যা, বোমাবাজী, গুপ্ত হত্যা করা ইসলামী রাষ্ট্র সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ নয়। বরং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্তরায়।
মানুষ খুন সম্পর্কেঃ
ইসলাম ধর্ম খুন-হত্যার মাধ্যমে তথা তরবারির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছে অনুপম আদর্শের মাধ্যমে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা এর জলন্ত নমুনা দেখতে পাই।
মানুষ খুন করার পরিনাম সম্পর্কে কুরআনে ঘোষাণা হচ্ছে- অর্থাৎ- যে ব্যক্তি ইচ্ছে করে কোন মুমিনকে হত্যা করবে তার শাস্তি হল জাহান্নাম, সে সেখানে দীর্ঘকাল থাকতে বাধ্য হবে। তার প্রতি আল্লাহ তাআলা ভীষণ গজব আরোপ করবেন। তাকে রহমত থেকে বহু দূরে নিক্ষেপ করবেন এবং তিনি তার জন্যে কঠোর আজাব (শাস্তি) প্রস্তুত করে রেখেছেন। (আল নেছা, আয়াত ঃ ৯৩)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারী (রাহঃ) রইছুল মুফাসিসরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর বক্তব্য তুলে ধরেণ।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, উক্ত আয়াতটি হত্যার অপরাধ সম্পর্কে নাযিলকৃত সর্বশেষ আয়াত। সুতরাং, এ আয়াতটির হুকুম সর্বদা বলবৎ থাকবে। যার সুষ্পষ্ট অর্থ হল, স্বেচ্ছায় কোন মুমিন হত্যাকারী ব্যক্তিকে অবশ্যই জাহান্নামী হতে হবে। এ বিষয়ে তার তাওবাও কবুল হবে না।
যুদ্ধে মানুষ খুন হয়, মারা যায়। এ সমস্ত কর্মকান্ড পরিহার করে শান্তি ও নিরাপদ পরিবেশ কামনা করার জন্য রাসূল (সাঃ) নির্দেশ দিয়েছেন এবং আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করার জন্য হুকুম করেছেন। এরশাদ হচ্ছে,অর্থাৎ- তোমরা শত্র“র সাথে যুদ্ধ কামনা করোনা বরং আল্লাহর নিকট নিরাপত্তা প্রার্থনা কর। (বুখারী, হাদীস নং- ৬৭৩০) অর্থাৎ- প্রকৃত মুসলিম সে লোক যার মুখের দুর্ব্যবহার ও হাতের অনিষ্ট থেকে অপরাপর মুসলিমরা নিরাপদ থাক।
সমাজে বসবাসরত অমুসলিমদের সাথে খুন-হত্যা পরিহার করে সুন্দর ও ন্যায় নিষ্ঠা আচরণে উৎসাহী করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, অর্থাৎ- আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে সে সকল (অমুসলিম) লোকদের সাথে সদ্ব্যব্যবহার ও ন্যায়-নিষ্ঠা আচরণ করতে নিষেধ করছেন না। যারা তোমাদের ধর্মীয় বিষয়াদিতে তোমাদের সাথে সংঘাত সৃষ্টি করেনা এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ি ত্যাগ করতে বাধ্য করে না। আল্লাহ তাআলা ন্যায়-নিষ্ঠা আচরণকারীদের ভালবাসেন। (আল মুমতাহানাহ, আয়াত ঃ ০৮)
মুসলিম রাষ্ট্রে বা সমাজে বসবাসকারী বৈধ নাগরিককে বিনা বিচারে হত্যা করা ইসলামে কঠোরভবে নিষিদ্ধ। এ সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) কঠোর সতর্ক করে বলেন, অর্থাৎ- যে ব্যক্তি নাগরিক অধিকারের চুক্তিতে চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের কোন ব্যক্তিকে হত্যা করে সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবেনা। অথচ জান্নাতের সুগন্ধ ৪০ দিনের সফরের দূরত্বে থেকেও পাওয়া যাবে। (বুখারী, ১ম খন্ড, হাদীস নং- ২৯২৮)
এ ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা (রাহঃ) এর মতে কোন চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম বৈধ নাগরিককে খুন করার অপরাধে খুনীকে বিচারের মাধ্যমে হত্যা করা বৈধ।
রাসূল (সাঃ) আরো বলেন, অর্থাৎ- হুশিয়ার, সাবধান। যে ব্যক্তি নাগরিকের অধিকারের চুক্তিতে চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের কোন ব্যক্তিদের প্রতি জুলুম করবে অথবা তার অধিকার খর্ব করবে কিংবা তার উপর তার অসাধ্য কোন দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে তাকে সীমাহীন কষ্টে ফেলে দিবে এবং তার অমতে তার কোন সম্পদ আত্মসাৎ করবে আমি (রাসূল) কিয়ামতের মহাবিচারের দিন তার বিরুদ্ধবাদী হয়ে দাঁড়াব। (আবু দাউদ শরীফ, খারাজ অধ্যায় )
কোন নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করা জঘন্য অপরাধ। চাই সে মুসলিম হউক অথবা অমুসলিম হউক। এ ব্যাপারে কুরআনে কারীমে আদরা বলা হয়েছে-
অর্থাৎ- এমন কোন লোক যে কোন মানুষকে হত্যা করেনি কিংবা পৃথিবীতে ফেৎনা ফাসাদ সৃষ্টি করেনি তাকে যে ব্যক্তি হত্যা করল সে যেন গোটা মানব জাতিকে হত্যা করল। অর্থাৎ হত্যা করার কারণে বিপদজনক কাজের সূচনা করল।
কোন ব্যক্তির বা সমাজের সাথে মতের অমিল থাকতে পারে। ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হতে পারে। পারস্পারিক মনমালিন্য সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু তার কারণে মানুষকে হত্যা করা, ছিনতাই-গুম কোরআন-হাদীসের কোথাও বলা হয়নি। বরং শত্র“র সাথে ইনসাফ পূর্ন ব্যবহার দেখাতে বলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে কুরআন শরীফের বক্তব্য হল-অর্থাৎ- কোন জাতির প্রতি শত্র“তা যেন তোমাদেরকে তাদের প্রতি ন্যায়, নিষ্ট আচরণ না করার অপরাধে লিপ্ত না হয়। বরং (সকল অবস্থায়) ন্যায়, নিষ্ট আচরণের পথ অবলম্ভন করবে। আর এটাই হলো আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টি ও আজাব থেকে আত্ম রক্ষার অধিকতর নিকটতম ব্যবস্থা। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সব কিছুই জানেন। (আল মায়েদাহ, আয়াত ঃ ০৮)
খুন-হত্যা রাহাজানীর পথ পরিত্যাগ করে কুরআন-হাদীস মোতাবেক জীবন পরিচালিত করলে আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে সাহায্য আসবে। এ ব্যাপারে কুরআনে বলা হয়েছে-
অর্থাৎ- আর তোমরা আল্লাহ তাআলার আদেশ নিষেধের অনুগত্য কর এবং তাঁর রাসূলেরও। তাছাড়া তোমরা পরষ্পরে বিবাদ-সংঘাতে লিপ্ত হয়ো না। নতুবা তোমরা সাহসহীন হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব প্রতিপত্তি খুয়ে যাবে। আর তোমরা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালনে অটল থাকবে। যারা দ্বীনের পথে অটল-অবিচল থাকে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাহায্যকারী। (আল তাওবাহ, আয়াত ঃ ৪৬)।
হত্যার মত জগন্য কর্মকান্ডে লিপ্ত ব্যক্তিরাই জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে। মহানবী (সাঃ) বলেন,অর্থাৎ- দুই মুসলিম ব্যক্তি (অথবা দুইজন মুসলিম) যখন তাদের নিজ নিজ তরবারী তথা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পরষ্পরে যুদ্ধে লিপ্ত হবে তখন তাদের হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয় জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে। (মুসলিম শরীফ, ২য় খন্ড, ৬৫৯০)
মহানবী (সাঃ) খুন কিংবা হত্যা ও সন্ত্রাসী করে ইসলাম কায়েম করেন নাই। বরং তাঁর উত্তম আদর্শ আর ধর্য্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলাম ধর্ম।
মক্কা নগরীতে মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে আনতে নিরস্ত্র দাওয়াতী কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে তিনি বিরোধীদের চরম বিরোধীতার রোষানলে পড়েছিলেন। যার দরুণ মহানবী (সাঃ) কে নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করতে হয়েছিল। পরিহার করেছিলেন সশস্ত্র সংঘাত। অথচ রাতের গভীরে আকাবায়ে ছানীতে অনুষ্ঠিত সভায় প্রস্তাব উঠেছিল, মক্কার নেতৃস্থানীয় মুশরিকদের হত্যা করে দিলেই ইসলামের কাংখিত বিজয় অর্জিত হবে। কিন্তু মুক্তির দূত, শান্তির বার্তা বাহক মহানবী (সাঃ) মানুষের রক্ত ঝরাতে পছন্দ করেন না। তাই গভীর রাতের বৈঠকের প্রস্তাবে সম্মত হননি। বরং মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে অশ্র“সিক্ত নয়নে মদিনায় হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন। এতে প্রমাণিত হয় গুপ্তহত্যা কিংবা বোমাবাজী করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ নয়।
আওস ও খাজরাজ গোত্রের দীর্ঘদিনের চরম দন্দ্ব নিরসন করে মদিনার সনদ শান্তিচুক্তি করে বিশ্বের দরবারে চির স্মরণীয় হয়ে আছেন।
১৪/১৫ শত সাহাবী নিয়ে দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ওমরাহ পালনে মহানবী (সাঃ) মক্কা শরীফ আসতে চাইলে পথিমধ্যে হুদায়বিয়া নামক স্থানে বাঁধার সম্মূখীন। অনেক সাহাবী প্রস্তুত নিলেন যুদ্ধ করে হলেও মক্কা শরীফ তওয়াফ করবেন। বিশেষ করে যারা মহাজির তারা বাড়ীর নিকটে এসে ফিরে যাবেন কোন অবস্থাতেই মেনে নিতে পাড়ছিলেন না। তাই যে কোনভাবে হউক মক্কা শরীফ ও নিজ মাতৃভূমি যিয়ারত করবো। নবীজী তাতে রাজি হলেন না। অন্যদিকে হযরত ওমর (রাঃ) যুদ্ধের অনুমতি না পেয়ে মাহনবী (সাঃ) কে প্রশ্ন করেন আমরা শহীদ হয়ে গেলে জান্নাতি হবো। তথাপি শত্র“দের বাঁধায় আমরা মক্কা যিয়ারত না করে কেন ফিরে যাব?
মহানবী (সাঃ) দেখলেন, সেদিন অনেক রক্তপাত হবে। তিনি রক্তপাত ঘটাতে পছন্দ করেন না। তাই তিনি সে দিন অসীম ধৈর্য্যরে পরিচয় দিলেন। সংঘাতের পথ পরিহার করে হুদায়বিয়ায় শান্তিচুক্তির মাধ্যমে শান্তির পথ বেছে নিলেন।
এই হল সামাজিক শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করে। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার ও ইনসাফ পূর্ণ আচরণের পক্ষে ইসলামী জীবনাদর্শের বাস্তব নমুনা। যার ফলে প্রায় বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় সূচীতে হয়েছিল।
জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাস ঃ জঙ্গী ও জঙ্গীবাদ শব্দদ্বয় ইংরেজী গরষরঃধহ ধহফ গরষরঃধহপু শব্দদ্বয়ের বাংলা অনুবাদ। এ গুলি আমাদের মাঝে পরিচিত ছিল না। ইদানিং প্রকৃত জ্ঞান বিবর্জিত অতি উৎসাহী ইসলামী নামধারী ব্যক্তির ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার নামে বোমাবাজী ও উগ্রতা আমাদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠে।
অভিধানে এগুলো খারাপ অর্থে ব্যবহৃত হত না। শাব্দিক ও রূপকভাবে যোদ্ধা, সৈনিক বা যুদ্ধে ব্যবহৃত বস্তু বুঝাতে এ শব্দগুলি ব্যবহৃত হত। শ্রী শৈলেন্দ বিশ্বাস রচিত সংসদ বাংলা-ইংরেজী অভিধানের ৪৬২ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার কমান্ডার ইন চীফকে ‘জঙ্গিলাট’ বলা হতো।
বর্তমানে পত্র-পত্রিকার ভাষায় বুঝি যারা ইসলামের নামে বা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে কোন দল বা গোষ্ঠি উগ্রতা অস্ত্র ধারণ সহিংসতা বা খুন-খারাপি কাজে জড়িত তাদেরকে বলে জঙ্গি। আর যারা রাজনৈতিক দলের নামে বা মতবাদ নিয়ে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য উগ্রতা, অস্ত্রধারণ, সহিংসতা বা খুন-খারাপিতে লিপ্ত হয় তাদেরকে সন্ত্রাসী বলে।
বর্তমানে সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদ নামে উগ্রতার পথ বেছে নিয়েছে কিছু প্রকৃত জ্ঞান বিবর্জিত ব্যক্তি এদেরকে পরিহার করা মুসলিম মিল্লাতের উচিত। ইসলামের নামে উগ্রহতা খুন-খারাপি, বোমাবাজী মহানবী (সাঃ) এর ৬৩ বৎসর জীন্দেগীতে হয়নি। সুতরাং তা পরিত্যাগ ইসলামের আসল উদ্দেশ্য ও জিহাদের মর্ম। না বুঝার কারণে এ সবের আবির্ভাব হয়েছে। আবেগের ভশীভূত হয়ে জিহাদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ না বুঝে যারা এসব সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নস্যাৎ করতে চক্রান্তে পিপ্ত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে নিতে হবে যুগপোযোগী বাস্তব পদক্ষেপ। সঠিক ইসলামী জ্ঞান না থাকাই সরলপ্রাণ মুসলমান জঙ্গিবাদদের খপ্পরে পড়ে বা পড়ার মূল কারণ। তাই ইসলামী জ্ঞানর্জনে মুসলিম জাতিকে উৎসাহিত করা এবং তার বাস্তবায়ন করলেই এর প্রতিকার করা সম্ভব। শুধু মাদ্রাসায় নয় স্কুল, কলেজগুলোতে কোরআন-হাদীসের শিক্ষা প্রসার করলে মানুষ জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসীদের অপব্যাখ্যা আর প্রলোভনের স্বীকার হবে না। কোরআন-হাদীসের প্রকৃত জ্ঞান না জানার কারণে এসব হচ্ছে। তাই মাদরাসার পাশাপাশি স্কুল, কলেজে মহা গ্রন্থ আল কুরআন ও হাদীস শরীফ পাঠ্য তালিকা করা হউক। তবেই খুন, কারাপি, নিঁেখাজ-গুম থেকে জাতি রেহাই পাবে।


Saturday, 4 June 2016

সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী রহ. এর সঠিক ইতিহাস

   
মাওঃ আবুল কালাম আজাদ
.........................মাওলানা আবুল কালাম আজাদ

১৮৮৫ সাল । এশিয়া মহাদেশ তথা বার্মা থেকে হিমালায়ন বিরাট এলাকা বৃটিশদের শাসনাধিনে চলে যায় । তখন ভারতে দুটি জাতি হিন্দু ও মুসলমানের অবস্থান ছিল । বৃটিশদের আধিপত্য থেকে মুক্তি পেতে অনেক আজাদী আন্দোলন সংগ্রাম সংঘঠিত হয় এ উপমহাদেশে । এর মদ্ধে সাইয়্যিদ শহীদ আহমদ বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর আন্দোলন অবিস্মরনিয় । উপমহাদেশের মুসলমান ও হন্দিু সম্প্রদায় বৃটিশ খ্রিষ্টানদেরকে অন্যায় জবরদখলকারী হিসেবে চিহ্নিত করলেও স্থানীয় হিন্দুরা উপমহাদেশে খ্রিষ্টান শাসনকে সহঝ ভাবে মেনে নিয়েছিল । কিন্তু মুসলমানরা এদের শাসন ক্ষমতা মেনে নিতে পারেনি । মুসলমানদের অসহযোগি মনভাব আর হিন্দু সম্প্রদায়ের আনুগত্য নিয়ে বৃটিশরা শুরু করে ভারত উপমহাদেশের শাসন । মুসলমানরা তাদের শাসন ভান মেনে না নিয়ে এ অবস্থাতে “দারুল হারব” তথা শত্রু আক্রান্ত অঞ্চল বলে ঘোষণা করেন । ইসলামের দৃষ্টিতে দারুল হারব হল- সেখানে ইসলামী হুকুমত ক্বায়েম করার জন্য জিহাদ চালিয়ে যাওয়া অথবা সেখান থেকে হিজরত করা মুসলমানদের ফরজ হয়ে পরে । সেদিন অনুগত হিন্দুদের সহযোগিতায় বিদেশী বেনিয়াদের দখলে ইপমহাদেশ চলে যাওয়াতে মুসলমানরা শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাচ্যুত হয়নি বরঙ তাদের ধর্মীয়, শিক্ষা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, এবং সাংস্কৃতিক অগ্রাসনের শিকার হন । যে ভূমি আন্তর্ঝাতিক অঙ্গনে ‘দারুল ইসলাম’ (মুসলিম রাষ্ট্র) হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ তা মুসলমানদের উপর অত্যাচার-নিপিড়নের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয় । ১৭৫৭ সালের পর থেকে পুরো ১০০ বছরের বেশী কাল পর্যন্ত মুসলমানরা হারিয়ে যাওয়া ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য এবং ইসলাম ও মুসলীম জাতীকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিপ্লবের আগুন প্রজ্জ্বলিত রাখেন । মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অবসান, বর্বর মারাটিদের আক্রমণ, পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজদের অনৈতিক নিয়ম বহির্ভুত জয়, পাঞ্জাবের শিখদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ এসব পরিবেশ পরিস্থিতির ফলে বৃটিশ বেনিয়ারা উপমহাদেশের আদিবাসীদের ঘাড়ে ভাগ্য নিয়ন্ত্রা হিসেবে জগদ্দল পাথরের মতো চেঁপে বসল । মুষলমানদের কিছু ভুলের কারনে সব হারিয়ে গেলেও তাদের অমূল্য সর্ব শেষ সম্পদ ‘ঈমান’ টুকু তারা হারানোরোধ করতে যে কোন কিছুর বিনিময়ে প্রস্তুত ছিল । ঈমান রক্ষার তাগিদে মুসলমানগণ নতুন চেতনা নিয়ে আবার ইসলামী হুকুমত ক্বায়েম এর স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন । ঝীবন মরন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মজলুম মুসলমানরা । এ সংগ্রামের মধ্যে উল্লেকযোগ্য হচ্ছে-১৮৫৭ সালের দেশ ব্যপী গন আনেদালন, ১৮৬৪ সালের সীমান্ত অভিযান, ১৭৬৫ সালে ফকির বিদ্রোহ, তিতুমীর রহ. এর বিপ্লব, হাঝী শরীয়াতুল্লাহ রহ. এর বিপ্লব, দুদু মিয়ার আন্দোলন, এবং সৈয়দ আহমদ শহীদ রহ. এর ঐতিহাসিক বালাকোটের জিহাদ ইত্যাদি । তিনি তার পুরো জীবন কাটিয়ে দেন মুসলীম জাতীর হারানো গৌরব পুনুদ্ধারে । তিনি দেশের পরিবেশ গভির ভাবে অবলকন করেন । পরিবেশ প্রতিকূল থাকায় তিনি কৌশলগত কারনে সরাসরি সরাসরি রাজনৈতিক আন্দোলনের পথে না গিয়ে বিভিন্ন ধর্মিয় সংস্কার কাজের মাধ্যমে আন্দোলন শুরু করেন । তার আন্দোলনের নাম ছিল ‘তরিকায়ে মুহাম্মাদীয়া’ তিনি মুসলমানদের পতনের মূল কারণ হিসেবে দেখলেন, মুসলমানরা সত্যিকার ইসলামী আদর্শ থেকে সরে যাওয়া । তাই তিনি কুরআন-হাদীসের প্রতি কঠোর আনুগত্যকে ভিত্তি করেই বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সুচনা করেন ।
সৈয়দ আহমদ শহীদ বেরলভী রহ. এর জন্ম ও বংশ পরিচয়:-
১ম মত:-হযরত হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু তিনার বংশের কিছু লোক ১২১১ সাল থেকে ১২৩৬ সালে ভারতবর্ষে আগমন করেন । তখন ভারতবর্ষের সুলতান ছিলেন শামসুদ্দিন ইলতুতশিশ । তারা এসে ভারতের মানিকপুর নামক স্থানে বসবাস করেন । আর এখান থেকেই ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন । হযরত সিইয়্যিদ আহমদ বেরলভী রহ. এর পূর্ববর্তী ৪র্থ পুরুষগণ উত্তর প্রদেশের অযধ্যার রায়বেরলভী এলাকায় বসবাস করেন । তার ৪র্থ পুরুষ শাহ আলামুল্লাহ রহ. । তিনি ছিলেন প্রক্ষাত এক বুযুর্গ । যাকে শ্রদ্ধা করতো সম্রাট শাহ জাহান ও আওরঙ্গজেব । তাদের আগমনের উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম প্রচার । সৈয়দ শহীদ আহমাদ রহ. ১৭৮৬ সালের ২৯ নভেম্বর মোতাবেক ১২০১ হিজরীর ৬ সফর রায়বেরলভীতে সৈয়দ পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন । তার পিতা ছিলেন সৈয়দ মুহাম্মাদ ইরফান রহ. ।
(সুত্র:- দৈনিক ইনকিলাব)
২য় মত:-
সাইয়েদ আহমাদ শহীদ জন্মগ্রহণ করেন ২৯ই নভেম্বর ১৭৮৬ খৃষ্টাব্দে ভারতের অযোধ্যা জেলায়। তার বংশতালিকা চতুর্থ খলীফা আলী (আঃ)-এর সাথে মিলিত হয়েছে। বংশীয় রীতি অনুযায়ী চার বৎসর বয়সেই তাকে মক্তবে পাঠানো হয়। কিন্তু বাল্যকাল হতেই তাঁর মধ্যে শিক্ষার চাইতে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ অত্যধিক মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়। তাঁর নিকটে কপাটি তথা সৈনিকদের বীরত্বমূলক খেলা ছিল খুবই প্রিয়। তাঁর খেলাধূলার মধ্যে ব্যায়াম ও শরীরচর্চার বিষয়টি মুখ্য ছিল। সাইয়েদ সাহেবের ভাগিনা নওয়াব ওয়াযীরুদ্দৌলার সেনাপতি সাইয়েদ আব্দুর রহমান বলেন, সূর্যোদয়ের পর এক ঘণ্টা পর্যন্ত সাইয়েদ সাহেব ব্যায়াম-কুস্তিতে কাটাতেন। ফলে তিনি অত্যধিক শারীরিক সক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। সাইয়েদ সাহেবের জীবনের প্রারম্ভ থেকেই যুদ্ধের প্রতি আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। দ্বীনের স্বার্থে যুদ্ধ করার প্রবল মানসিকতা তখন থেকেই তাঁর মাঝে বিরাজ করছিল। একদা হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যায়। সাইয়েদ সাহেব তাতে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করলে তাঁর ধাত্রী মাতা তাঁকে কোন মতেই যেতে দিলেন না। আর তাঁর মা তখন ছালাতরত ছিলেন। সাইয়েদ সাহেব মাতার সালাম ফেরানোর অপেক্ষায় ছিলেন। মা সালাম ফিরিয়ে ধাত্রীকে বললেন, শোনো বিবি, আহমাদকে তুমি অবশ্যই স্নেহ কর, কিন্তু তা কখনো আমার স্নেহের সমান হতে পারে না। এটা বাঁধা দেয়ার সময় নয়। যাও বৎস, আল্লাহ নাম স্মরণ করে এগিয়ে যাও। কিন্তু সাবধান পৃষ্ঠ প্রদর্শন কর না। অন্যথায় তোমার চেহারা দেখব না। যদি শত্রুরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা ধরে তাহলে তাদের রাস্তা ছেড়ে দিও। সাইয়েদ সাহেব যখন সংঘর্ষস্থলে গিয়ে পৌঁছলেন তখন শত্রুরা বলতে লাগল, আমাদের রাস্তা ছেড়ে দিন আমরা চলে যাব। আপনাদের সাথে কোনো বিবাদ নেই। তখনই তিনি সাথীদের বললেন, এদের যেতে দাও কোন প্রকার বাধা দিও না।(সুত্র:- বাংলা পিডিয়া)
সাইয়্যেদ আহমদ ব্রেলভী রহঃ এর বংশগত শাজরা নিম্নে তা ক্রমানুসারে উল্লেখ করা হলঃ
১/ হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
২/ হযরত ফাতেমা রাঃ, সহধর্মিণী হযরত আলী রাঃ
৩/ হযরত ইমাম হাসান রাঃ
৪/ হযরত হাসান মুছান্না রঃ
৫/ হযরত আব্দুল্লাহ আল-মাহাদ রঃ
৬/ হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ সাহিবুন নাফসিজ যাকারিয়া রঃ
৭/ হযরত সৈয়দ আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ রঃ
৮/ হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ সানী রঃ
৯/ হযরত সৈয়দ হাসান রঃ
১০/ হযরত সৈয়দ আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ রঃ
১১/ হযরত সৈয়দ কাছিম রঃ
১২/ হযরত সৈয়দ আবু জাফর মুহাম্মদ রঃ
১৩/ হযরত সৈয়দ আবুল হাসান আলী রঃ
১৪/ হযরত সৈয়দ হাসান রঃ
১৫/ হযরত সৈয়দ ঈসা রঃ
১৬/ হযরত সৈয়দ ইউসুফ রঃ
১৭/ হযরত সৈয়দ রশীদুদ্দীন আহমদ মাদানী রঃ
১৮/ হযরত সৈয়দ কুতুবুদ্দীন মুহাম্মদ আল হাসানী ওয়াল হোসাইনী রঃ
১৯/ হযরত সৈয়দ নিযামুদ্দীন রঃ
২০/ হযরত সৈয়দ রুকনুদ্দীন রঃ
২১/ হযরত সৈয়দ সদরুদ্দীন রঃ
২২/ হযরত সৈয়দ কিয়ামুদ্দীন রঃ
২৩/ হযরত সৈয়দ আলী রঃ
২৪/ হযরত সৈয়দ আহমদ রঃ
২৫/ হযরত সৈয়দ যায়নুদ্দীন রঃ
২৬/ হযরত সৈয়দ যায়িদ সদরুদ্দীন সানী রঃ
২৭/ হযরত সৈয়দ কুতুবুদ্দীন মুহাম্মদ সানী রঃ
২৮/ হযরত সৈয়দ আলা উদ্দিন রঃ
২৯/ হযরত সৈয়দ মাহমুদ রঃ
৩০/ হযরত সৈয়দ আহমদ রঃ
৩১/ হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ মুয়াযযাম রঃ
৩২/ হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ ফাযায়েল রঃ
৩৩/ হযরত সৈয়দ ইলমুল্লাহ রঃ
৩৪/ হযরত সৈয়দ হুদা মুহাম্মদ রঃ
৩৫/ হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ নূর রঃ
৩৬/ হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ ইরফান রঃ
৩৭/ হযরত সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী রঃ
তথ্যসূত্রঃ সীরাতে সৈয়দ আহমদ শহীদ রহঃ পৃঃ ৯২, ছাওয়ানিহে আহমদী, আয়নায়ে উধ, মাখযানে আহমদী।
( সৈয়্যেদ সাহেব "মা" যেমন ছিলেন অত্যন্ত খোদাভীরু ও দ্বীনদার তেমনি তাঁর বাবাও)
জেহাদের উদ্যম ও মায়ের ত্যাগ:
একবার কতিপয় অত্যাচারী পৌত্তলিকেরা মুসলমানদের উপর আক্রমণ করে। পাড়া প্রতিবেশী মুসলমানেরা অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়েন, সৈয়্যেদ সাহেবও যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেন। কিন্তু খাদিমা তাঁকে বার বার বারণ করতে থাকে। আম্মা সাহেব তখন নামাজে রত ছিলেন। নামাজান্তে "মা" খাদিমাকে ডেকে বললেনঃ "তুমি আহমদকে ভালবাস সত্য কিন্তু আমার চেয়ে বেশী নয়। এখন বারণ করার সময় নয়" তারপর সৈয়্যেদ আহমদ (রঃ) কে সম্বোধন করে বললেন "বাবা, আল্লাহর নামে বেরিয়ে পড়ো কিন্তু সাবধান কাফেরদের ভয়ে পালিয়ে এসনা। যদি পালিয়ে আস তাহলে তোমার মুখও আর দেখব না"
সৈয়্যেদ সাহেব ঘটনা স্থলে উপস্থিত হয়ে দেখলেন যে ঝগড়াটার মীমাংসা হয়ে গেছে।

শিক্ষা জীবন:-
সা্ইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী রহ. এর কৈশর জীবনের লেখা পড়ার সার সংক্ষেপ হচ্ছে বংশের নিয়মানুযায়ী চার বছর চার মাস চার দিনের সময় মক্তবের মাধ্যমে শুরু করেন প্রাথমিক শিক্ষা । শিক্ষার্জনে পরিবারের পক্ষ থেকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয় । তিন বছর মক্তবে অধ্যয়ন করে পবীত্র কুরআন শরীফ শিক্ষা করেন । তিনি ফরাসী ভাসায় পারদর্শী ছিলেন । ইলমে শরীয়াতের মৌলিক খুটিনাটি বিষয়েও ছিলেন সমান পারোদর্শী । পবিত্র কুরআন-হাদীসের ব্যাখ্যা সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করে সবার নিকট প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেন । অধিক শিক্ষা অর্জনের জন্য তিনি লাক্ষনৌতে গমন করেন । সেখানে অধ্যয়নের পাশাপাশি জিহাদের চেতনা তার মধ্যে প্রবলভাবে জাগ্রত হয় । লাক্ষনৌর বিদ্যার্জন সমাপ্তি টেনে তিনি দিল্লির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন । সেখানে শাহ আব্দুর রমি মুহাদ্দেসে দেহলভী রহ. এর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় লেখা পড়া করেন । সর্বকালের অনুষ্মরণীয় মুহাদ্দিস, তৎকালিন যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দেস দেহলভী রহ. এর নিকট ১৮১৭ সালে শিষ্যত্ব লাভ করেন ।
শৈশব কাল :-
তিনি একজন মুজাহিদ হয়ে ইসলামের জন্য জিহাদ করবেন তার শৈশবকালের আচরণ থেকে বুঝা যায় । তিনি নিয়মিত শরীর চর্চার মাদ্ধমে শারীরিক যোগ্যতা অর্জনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতেন । সাইয়্যিদ সাহেব পানিতে সাঁতার কাটতেও দক্ষ ছিলেন । পানির নিচে ডুব দিয়ে তিনি অনেকক্ষণ থাকতে পারতেন, ডুব দিয়ে থাকা অবস্থায় দ’রাকাত নফল নামায পড়া যেত । পড়ার সাথীদের নিয়ে তিনি ‘লশকর-ই-ইসলাম নামে’ একটি সংগঠন করেন । সর্বদা অভাবী মানুষের প্রতি ছিল তার আলাদা সুনজর । শিক্ষা জীবনে তিনি হিন্দু সমাজের কুসংস্কার মুসলিম সমাজে প্রভাববিস্তারে আলামত দেখতে পান । মুসলীম জাতীর দূর্বলতা, কাপুরুষতা তার নজরে ধরা পড়ে । কিভাবে এই অবস্থা থেকে জাতীকে জাগিয়ে তোলা যায় তার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন ।

বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ :-
১২১২ হিজরীর শেষ দিকে দিল্লী থেকে লেখা পড়া শেষ করে বাড়িতে চলে আসেন আত্মীয়-স্বজনরা এ সময় তার বিবাহের বন্দবস্ত করেন । নাসিরাবাদের বিবি জোহরার সাথে তিনার শুভ বিবাহ হয় । ১২২৪ হিজরীতে ‘সারা’ নামে এক কন্যা সন্তান তার ঘর আলোকিত করে । সৈয়দ সাহেব বাড়িতে আসলে তার নির্ধারিত কর্ম সূচিতে সময় ব্যয় করতেন । নিকটবর্তী এলাকায় দাওয়াতী কাজ, পারিবারিক, বংশীয় এবং গ্রামের বিভিন্ন ঝগড়া-বিবাদের সমাধান করে পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তুলতেন এবং জিহাদী প্রেরণায় উজ্জীবিত করতেন ।
তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থা :-
তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয় । মুসলমান শাসকগণ ইসলামী আদর্শের পরিবর্তে বিভিন্ন অপকর্ম ও আরাম-আয়েশে দিন কাটিয়ে দেন । কিন্তু এ উদাসীনতার পরিণাম সম্পর্কে একবারও চিন্তা করেননি । মোগল সম্রাজ্যের শক্তি তখন নিভু নিভু অবস্থা । নিরাশার মধ্যে আশার আলো জ্বাগিয়ে দিতে এগিয়ে আসলেন মরদে মুজাহিদ, হায়দার আলী ও টিপু সুলতান । মুসলমানদের জাগিয়ে তুলতে তাদের প্রচেষ্টা এক অনন্য ভূমিকা পালন করে । কিন্তু মুসলমানদের স্বার্থ পরতা ও পরস্পরের বিরোধিতার ফলে তাদের আন্দোলন সফলতার মুখ দেখেনি । এ সুযোগে মারাঠারা মোগল সম্রাজ্যের বিশাল এলাকায় হাঁটু গেড়ে বসে । মুসলমানদের আভ্যন্তরিণ কোন্দল, অরাজকতা ও নবাব আলীবর্দী খানের ইন্তেকালের কারণে কিছু দিন পর বাংলা, উড়িশ্যা, বিহার ইংরেজ বেনিয়াদের দখলে চলে যায় । এর পরই ইংরেজরা দিল্লী দখল করে । এ পরিবেশ পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন সৈয়দ আহমদ শহীদ রহ. । ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় এ সময় মুসলমানগণের জন্য তিনটি মাত্র পথ খোলা ছিল । ১. সত্যের পথ ছেড়ে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে গা ভাসিয়ে দেওয়া । ২. সত্যের পথ আকরিয়ে ধরা এবং এর ফলে যত ঝড় তুফান আসুক ধৈর্য-সংজমের সাথে সহ্য করে শেষ হয়ে যাওয়া । ৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রাণ পণ জিহাদ করে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া । এ দুরাবস্থা কবলিত মুহূর্তে ইসলামী আন্দোলনের বীর সিপাহ সালার সৈয়দ আহমদ রহঃ তৃতীয় পথ তথা জিহাদের পথ বেছে নিলেন । তাই ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে নবাব আমির খানের সেনা বাহিনীতে যোগদান করেন । কারণ, আমির খানের অধিনে চল্লিশ হাজার সিপাহী এবং একশত চল্লিশটি তোপ ছিল । এটা ছিল ইংরেজদের একটি ভয়ের কারন । এ বিরাট শক্তি মুসলমানদের কাজে লাগানোর জন্য তিনি যোগদান করেন । কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে নবাব আমির খান ইষ্ট ইন্ডিয়া কম্পানির সাথে হাতে হাত মিলান । সেদিন থেকে সৈয়দ শহীদ আহমদ বেরেলভী রহঃ সে বাহিনী থেকে বেরিয়ে আসেন । কারণ মুসলমানদের উপকারে আসার আর সুযোগ রইলো না ।

জীবনের মিশন:-
জীহাদী চেতনা নিয়ে সৈয়দ আহমাদ শহীদ বেরলভী রহমাুতল্লাহি আলাইহি বীর সংগঠকরূপে গমন করতে থাকেন ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল । মুসলমানদের ইসলামী শরীয়াতের অলোকে চরিত্র গঠনের দাওয়াতী কাজে মনোনিবেশ করেন । ইসলামী শাসন ওকিশুদ্ধ আকিদাহ প্রতিষ্ঠাই ছিল তার লক্ষ । চরিত্র সংশোধন ও শরিয়াতের আনুগত্যের জীবন পরিচালনা করতে তার দরবারে হাজার হাজার মানুষের আগোমন ঘটতো ।

তরীকায়-এ-মুহাম্মাদী আন্দোলন:-
প্রথমে সূফীবাদের চার তরিকায় অর্থাৎা তিনি, চিশ্তীয়া, কাদেরিয়া, নাকশবন্দিয়া ও মুজাদ্দেদিয়ায় তরীক্বায় দীক্ষা দিয়ে পরে তাঁর মুরিদদের মুহাম্মদীয়া তরিকায় দীক্ষা দিতেন । সূফীবাদ বা আধ্যাত্মিক চিন্তা ধারায় এ তরিকার কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু ছিল সমাজ সংস্কার ও জিহাদ । এ মুহাম্মদি তরিকায় আধ্যাত্মিক জীবন ও মারিফাতের সাথে শরিয়তের আইন - কানুন প্রবর্তনের প্রতি অধিক মনোযোগ দেয়া হয় । ঐতিহাসিকদের মতে, তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া ছিল সূফীবাদের উদাসীনতা ও ধমীয় আচার-আচরণের প্রতি অবজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ। পীর পূঁজা, কবর পূঁজা, হজ্জ পালনে বাঁধাদান, বিধবা বিবাহে আপক্তি, শিয়াদের ভ্রান্ত মতবাদ ও অন্যান্য কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইমামুল হিন্দ শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিছে দেহলভী (র.)-এর ক্ষোভ ও প্রতিবাদের বহিঃপ্রাকাশ ঘটেছে তাঁর পুত্র ও খলিফা সিরাজুল হিন্দ ইমাম শাহ আব্দুল আযীয দেহলভী (র.)-এর তারগীব-ই-মুহাম্মদিয়া বা তরিকেয়ে মুহাম্মদিয়া। তাঁরই নিদর্েশে সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (র.)সংস্কার ও জিহাদ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এ মুহাম্মাদি তরিকার সাথে অন্যান্য তরিকার কোন মৌলিক পার্থক্য নেই ।তবুও সশস্ত্র সংগ্রামের কর্মসূচী থাকায় এ তরিকায় আধ্যাত্মিক দর্শনের সাথে রাজনীতির প্রত্যক্ষ যোগাযোগ।
যামানার শ্রেষ্ঠতম আলিম ও ওলি-আল্লাহ মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী সাহেবের মতে, এ মুহাম্মদি তরিকার দ্বারা অন্যন্য চার তরিকার বিরোধিতা করা হয়নি,এ মুহাম্মদি তরিকার দ্বারা অন্যন্য চার তরিকার বিরোধিতা বিরোধিতা করা হয়নি।পূবর্োক্ত চার তরিকার সমন্বয়ে আধ্যাত্মিক ও পার্থিব উন্নতির পত প্রদর্শিত হয়েছে এ তরিকায়। তার মতে সাইয়্যেদ সাহেব এ তরিকাকে দুই ভাগে ভাগ করেন-রাহে বিলায়েত বা আধ্যাত্মিক পথ ও রাহে নবুয়ত বা নবী প্রদর্শিত পথ মিলেই তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া। কারো মতে তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া বলতে ধমর্ীয় সংস্কার, সমাজ সংস্কার ও সশস্ত্র সংগ্রাম বা জিহাদ আন্দোলন বুঝায়। এ আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের জন্যে সে সব আচার ও নীতির প্রবর্তন করা, যা হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর সময় প্রচলিত ছিল। সাইয়্যিদ আহমদ (র.) বলেছেন. আমার তরিকা আমার পিতকুলের,নবীদের শ্রেষ্ঠ নবীর তরিকা হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর তরিকা বা পথ ।আমি একদিন পেট পুরে আহার করি ও আল্লাহর প্রশংসা করি এবং অন্যদিন উপবাসে থেকে ধৈয্যর্ ধারণ করি।
উপমহাদেশের এমন কোন সিলসিলা বা দরবেশ পরম্পরা নেই যার বরেণ্য ব্যক্তিগণ সাইয়্যিদ সাহেবকে নিজের উধ্বর্ে ন্থান দেননি এবং তাঁর নিকট থেকে উপকৃত হননি। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও সর্বজন মান্য হওয়া এবং তাঁর তরিকার মহত্ব ও ফজীলত, তাঁর প্রতি ভালবাসা ও আস্থা রাখা সম্পর্কে সে যামানার সকল আলিম ও শায়খ একবাক্যে ঐকমত্য পোষণ করেছেন ।সাইয়্যিদ সাহেবের হাতে বাইআত করার ভিতরে রাসূলুল্লাহ ( সাঃ) -এর সন্তুষ্টি নিহিত রয়েছে বলে বিশ্বাস করতেন। তাঁর প্রতি ভালবাসা রাখা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশেষ আলামত বলে বিবেচিত হত। মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী সাহেব লিখেছেন- তাঁর (সাইয়্যিদ সাহেবের ) তরিকায় যে অগণিত বরকত ও আভান্তরীণ সৌন্দর্য রয়েছে তা'বলাই বাহুল্য ।বাহ্যিকভাবেও এতে একটি আশ্চর্যজনক বরকত পরিলক্ষিত হয় । তা' হল, কোন লোক তাঁর তরিকায় বাইআত হওয়ার ইচ্ছা করলে পূর্বাহ্নেই প্রতিমা পূজা,শিরক, বিদআত, নাচ,-গান ও ঢোল-তামাশা পরিত্যাগ করার উপর দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে তবে বাইয়াত হয়। সুতরাং সাইয়্যিদ সাহেবের দীক্ষা গ্রহণ করা এদেশে সত্যিকার অর্থেই ইসলাম গ্রহণের পরিচয় বাহক।
এক সফরে রামপুর অবস্থানকালে তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া সম্পর্কে সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী সাহেবকে প্রশ্ন করা হয়। তিনি উত্তরে বলেন, তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়ার তাৎপর্য এই-প্রত্যেক মানুষের প্রতিটি কাজ যেন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য হয়।যেমন-পাপ হতে বিরত থাকার জন্যে বিয়ে করা, শরিয়ত সিদ্ধ নিয়মে অন্ন সংন্থানের জন্য বৈধ সম্পদ সংগ্রহ করে নিজেকে ও পরিবারবর্গকে পরমুখাপেক্ষি হতে না দেয়া, রাতের শেষে তাহাজ্জুদ নামাজ ও ইবাদত করার উদ্দাশ্যে প্রথম দিকে নিদ্রা যাওয়া, এভাবে জীবনের প্রতিটি কাজে একমাত্র খোদার সন্তুষ্টি লাভকেই মূল উদ্দেশ্য মনে করা তরিকায়ে মুহাম্মদিয়ার সার।
মাওলানা কারামত আলী জৌনপূরী (র.) বলেন, হযরত পীর সাহেব তাঁর তরিকার নাম মুহাম্মদিয়া এ কারণে রেখেছিলেন যে, কোন কোন ওলি-আল্লাহ কোন কোন নবীদের পদানুসরণ করে চলে থাকেন, যা নজর বরকদম স্বরূপ।মুর্শিদ বরহক হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) -এর হুবহু পদানুসরণ করে চলতেন বলে তাঁর তরিকার নাম তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া রেখেছিলেনওলি-আল্লাহ কোন কোন নবীদের পদানুসরণ করে চলে থাকেন, যা নজর বরকদম স্বরূপ। কলকাতায় মৌলভী গোলাম সোবহান মরহুম হযরত মুর্শিদে বরহককে প্রশ্ন করেছিলেন-আপনি আপনার তরিকার নাম মুহাম্মদিয়া কেন রেখেছেন? তিনি উত্তর দেন, উহা "নজর বরকদম" এর ব্যাখ্যা স্বরূপ। এ উত্তরের বর্ণনা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ জাহের সাহেব লিখেছেন। তিনি মুর্শিদ বরহক এর নিকটতম আত্মীয় এবং খলীফাদের মধ্য ছিলে । ঐ সময় তিনি হযরত সাইয়্যেদ সাহেবের সঙ্গে ছিল। বর্ণনা নিম্নরূপ-তিনি বলেন, এরূপ বুঝে লও যে, কোন এক শহরের একজন বাদশাহ তার প্রত্যেক কর্ম ও ব্যবসায়ের আগ্রহ আছে। এজন্যে ঐ শহরের যত ব্যবসায়ী আছে প্রত্যেকে নিজ নিজ ব্যবসায় ও কারিগরীর দ্বারা বাদশাহকে সন্তুষ্ট করে এবং তার বাদশাহের নৈকট্যও লাভ করে। কারিগরদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে যে, কেউ একটি কারিগরী জানে, কেউ দু,টি কারিগরী জানে, আবার কেউ হয়তো তিনটি কারিগরী জানে। এভাবে যতই উপরে যাক প্রত্যেকেই নিজ নিজ কারিগরীর তুলনা বাদশাহের আকর্ষণ লাভ করছে। আর যত কারিগরীই হোন না কোন প্রত্যেকটিই বাদশাহর নিকট গ্রহণীয়। মনেকরুন, ঐ সকল লোকদের মধ্যে এমন লোকও আছেন, যিনি সর্ব প্রকারের কাজ ও কারিগরীতে দক্ষ এবং তিনি বাদশাহর নিকটতম। আরো মনে করুন, তাদের মধ্যে এমন লোকও আছেন, যিনি মুন্শীগিরিতে অদ্বিতীয় এবং তীর ব্যবহারে খবই পটু, অশ্বারোহণে বেশ দক্ষ, এবং কুস্তিগীর পলওয়ান, এমন অদ্বিতীয় সৈনিক যেন তিনি ষুদ্ধের মাঠে শত্রুদের সম্মুখ হতে পলায়ন করার কথা জানেন না, মিস্ত্রি ও কামারের কাজও খুব উত্তম জানেন, এ ভবে যত কারিগরী আছে, প্রত্যেকটির মধ্যে তাঁর বিশেষ আগ্রহ এবং দক্ষতা আছে। ঐ ব্যক্তি সর্বক্ষণ বাদশাহর দরবারে উপস্তিত থাকে। কারণ বাদশাহর যখন যে কাজের দরকার, তার দ্বারা ঐ কাজ করিয়ে নেন। এখন একথা জানা দরকার যে, পূর্ববতর্ী যত বুজুর্গ লোক যারা তরিকার মালিক যেমন-হযরত খাজা মঈন উদ্দিন চিশতি (র.) হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দি (র.) প্রমুখ প্রত্যেকেই আমাদের পেশওয়া আগ্রগামী ছিলেন এবং ঐ সকল বুজুর্গদের তরিকার মধ্যে আমি বাইআত গ্রহণ করে থাকি। আমি এ দাবী করি না যে, আমি তেঁদের চাইতে উত্তম।কিন্তু আল্লাহ তায়ালা আমাকে ঐ সকল বুজুর্গদের তরিকার মধ্যে ক্ষমতা দান করেছেন এবং আমি আল্লাহতায়ালার জিকির ও ইবাদাতে যেরূপ মগ্ন থাকি এবং আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র শুদ্ধির প্রতি যতটুকু দৃষ্টি রেখে থাকি, সেরূপ শক্তি আল্লাহ তায়ালা হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) কে বিশেষভাবে দান করেছিলেন, তা হতে এ ফকিরকে সামান্য পরিমাণে কিছু দেয়া হয়েছে। আর সে শক্তিগুলো হল-জিহাদের কাজ, হুদুদ ও কিছাছের আদেশ জারি, শিরক ও বিদআতগুলোর ধ্বংস করা ইত্যাদি। আল্লাহর রহমতে আমি ঐ কাজগুলোর সমাধান করার ক্ষমতা আমার মধ্যে বিদ্যমান দেখতে পাই। আল্লাহতায়ালা আমাকে শক্তি দান করেছেন এর দ্বারা আমি বাসনা এবং সে বাসনা দ্বারা আশা করি যেন ঘোড়ায় আরোহণ করে কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করি এবং যুদ্ধের অস্ত্র, তরবারি, নেজা, বশর্া, তীর, কামান বন্দুক ও পিস্তল বেঁধে এবং ঢাল নিজের শরীরে পরিধান করে আল্লাতায়ালার কলেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুল্লাল্লাহকে প্রচার করার জন্যে ঐ সকল কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করি। ঐ প্রকার প্রদত্ত শক্তির দ্বারা পরিখা খনন নিজ হাতে করতে পারি, কুড়াল হাতে করে কাঠ চিড়তে পারি, হুদুদ ও কিছাছ (শরিয়ত অনুযায়ী শাস্তি) জারি করতে পারি। অতএব, এ খাছ নিয়ামতের আকাংখায় আমি আমার তরিকার নাম মুহাম্মাদিয়া রেখেছি। কারণ, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ঐ সকল কাজগুলো আপন পাক জাতের দ্বারা সম্পন্ন করেছেন।
জৌনপুরী সাহেব বলেছেন, যেহেতু তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া এক কথায় হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) -এর হুবহু অনুসরণকারী, কাজেই যাবতীয় তামালত এ তরিকার মধ্যে একত্রিত হয়ে রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ধর্ম ও মাযহাবের উপর দৃঢ় থাকার কথা যা সুরায়ে হাশরের নিম্ন আয়াতের উপর আমল করলে হাছিল হয়, এর নামই তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া।
রাসুল তোমাদের জন্যে যে সকল আদেশ আনয়ন করেছেন তা গ্রহণ কর আর যা নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাক। (আল-কুরআন)।
তিনি বলেছেন, আসল কথা এই যে, তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া প্রবেশ করলে অন্বেষণকারী সরল তরিকাতেই প্রেবেশ করে। অপর দিকে তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়াকে অস্বীকার করলে সমস্ত তরিকাই অস্কীকার করাহয়। কাননা তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া সমস্ত তিকার সার।এ শরিয়ত অনুসরণ করার অর্থ সমস্ত শরিয়তের অনুসরণ করা।
তিনি আরোও বলেছেন, তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া শেষ যামানার লোকদের জন্যে কিমিয়া স্বরূপ। এ তরিকার অসাধারণ শক্তি এই যে, পীর ভাইদের মধ্যে পরস্পর ভালবাসা জন্মিয়ে দেয়। এ তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও প্রধান স্তম্ভ হল মোকামে উবুদিয়াত অর্থাৎ প্রকৃত বান্দায় পরিণত হওয়া।
তিনি বলেছেন, পঞ্চম তরিকা-তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া কোথা হতে আসল, একথা বলা অজ্ঞতার পরিচায়ক। পূর্ব হতেই বহু তরিকা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। এ চার করিকা ব্যতীত ,,চারি পীর চৌদ্দ খান্দান,, একথা যারা বলে তাদের একথা সম্পূর্ণ ভুল। প্রকৃত পক্ষে এসব কথা প্রত্যেকে নিজ নিজ জ্ঞানানুযায়ী বলেথাকে। পীরের খান্দান বহু আছেন এবং কি কিয়ামত পর্যন্ত হতে থাকবে।
তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিপরীত বিশ্বাস করবে, সে ব্যক্তিই তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়ার বিরোধী। তাঁর বর্ণনামতে-তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়ায় প্রবেশ করলে তার ফল এই হয় যে, সর্বসাধারণ স্ত্রী-পুরুষ কেবল তওবা করার জন্যে এ তরিকায় প্রবেশ করলে বাইআত করার সঙ্গে সঙ্গেই তারমধ্যে এক প্রকারের আন্তরিক পবিত্রতা তৎক্ষণাৎ লাভ হয়। যে ব্যক্তি ছুলুক ইল্লাল্লাহ (আল্লাহর নৈকট্য লাভ) এই নিয়তে এ তরিকায় প্রবেশ করে সে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার মেহেরবাণীতে ৮।১০ দিনের মধ্যেই নিজ উ!দ্দেশ্য অথবা উদ্দেশ্য লাভের কাছাকাছি উপস্তিত হতে পারবে,জিকির ও মোরাকাবার মিষ্টতা উত্তমরূপে বুঝতে পারবে।
হযরত মাওলানা শাহ্ মুহাম্মাদ আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী) বলেন, চার তরিকার প্রত্যেকটির নাম বিশেষ বিশেষ তরিকার বুজুর্গানদের নামকরণে হয়েছে। যেমন, হযরত বড় পীর সাহেব (র.) যে তরিকার তরবিয়ত দিতেন এর নাম কাদিরিয়া তরিকা। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দি (র.) এর তরবিয়ত প্রদানকৃত তরিকার নাম নকশবন্দিয়া তরিকা। হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী শায়খ আহমদ সিরহিন্দ (র.) যে তরিকার তালিম দিতেন এর নাম মুজাদ্দেদিয়া তরিকা। তেমনিভাবে আমিরুল মুমিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (র.) যে তরিকার তারবিয়ত দিতেন এর নাম তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া। তাঁর নিজের নামানুসারে তরিকায়ে আহমদিয়া না হয়ে তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া হওয়াই এ তরিকার বৈশিষ্ট্য। হযরত বেরেলবী (র.) -এর পূর্বেকার তরিকতের ইমামগণের সময়ে মানুষের জাহেরী আমল তুলনামূলক উত্তম ছিল। ইমামগণ শুধু মানুষকে বাতেনী ইলম ও আমলের তালিম দিতেন। হযরত বেরেলভী (র.) প্রত্যক্ষ করেন যে, তাঁর সময়ে মানুষের জেহেরী আমল আখলাক অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। শিরিক, বিদআত ও নানা ফেরকার জটিলতায় উপমহাদেশে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ বিরাজিত ছিল। পার্শ্ববর্তি ধর্মীয়দের অনেক আচার-অনুষ্ঠানই মুসলমানগণ মেনে চলতেন। তিনি জাহেরী আমল তথা জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামী আদব আখলাক শিক্ষা দিতেন এবং সাথে সাথে ইলমে বাতিনেরও শিক্ষা দিতেন। যেমতু রাসুলুল্লাহ (সা:) এভাবে জাহেরী ও বাতেনী আমলের তারবিয়ত দিতেন, তাই হযরত বেরেলভী (র.) তাঁর তরিকার নাম রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর নামানুসারে তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া নামকরণ করেন।এক প্রশ্নের জবাবে হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ বলেন, তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া সম্পর্কে হযরত সাইয়্যেদ আহমদ (র.) কে প্রশ্ন করলে, তিনি যে উত্তর দেন সে উত্তর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তাসাউফের প্রত্যেক তরিকতের উদ্দেশ্য ছিল জাহেরী শরিয়তের মাফিক নিজের অন্তরক রিয়াজত-মেহনত এবং ধ্যন দ্বারা সংশোধন করা। সাইয়্যেদ আহমদ (র.) যখন জিহাদের প্রস্তুতি নেন, তিনি প্রত্যক্ষ করেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগে যেভাবে কুফরী স্থানের মধ্যে ইসলামকে বিস্তার করা দরকার ছিল সেভাবে ভারতের অদ্ধকার ভূমিতে ইসলামের পুণর্জাগরণের ব্যবস্থ জিহাদ দ্বারা করতে হবে।কাজেই তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া তাঁর তরিকার নাম রাখেন। তাঁর কাছে তরিকার শোগল সম্পর্কে জাজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর দেন, এ তরিকার শোগল হবে (আয়াত শরীফের অনুবাদ) -'আপনি বলুন, আমার সালাত আমার কোরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশ্যে।' অর্থাৎ একজন মুসলমান তাঁর জীবনের প্রত্যেক মুহুর্তের কাজ আল্লাহর গোলামীর উদ্দেশ্যে করতে থাকবে এবং 'আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি, শুধু তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি (আল-কুরআন)-তা' তার জীবনের সব কাজে বাস্তবায়িত করতে থাকবে। অর্থাৎ তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়ার দ্বারা একজন লোক নিজকে নিজে খালিছভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মতের উপর বিলীন করে দিবে। এ উদ্দেশ্য জেনে ভারতের সত্য-খাঁটি উলামাগণ ও ধর্মপ্রিয় মুসলমানগণ এ তরিকাকে পছন্দ করেন এবং তরিকাভুক্ত হন, কেউ আপত্তি করতন না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি প্রশ্ন করি যে, সাইয়ি্যদ আহমেদ সাহেবের সময়ের উলামা এবং মুসলমানগণ ও তাঁর পার্শবর্তী যুগের উলামা মুসলমানগণ সাইয়্যিদ আহমদ সাহেব সম্পর্কে ভাল জ্ঞাত ছিলেন, না দেড় দুশ বছর পরের লোক তাঁর সম্পর্কে ভাল জ্ঞাত হন
তরিকায়ে মুহাম্মাদীয়া সম্পর্কে সার কথা হল , হিন্দুস্তানে তখন তিনটি প্রসিদ্ধ তরিকা প্রচলিত ছিল। চিশতিয়া, কাদিরিয়া ও নকশবন্দিয়া। তাছাড়া নকশবন্দিয়া তরিকার একটি শাখাকে মুজদ্দিদে আলফে সানীর (রঃ) মাধ্যমে প্রাপ্ত বলে মুজাদ্দেদীয়া বলা হত। সৈয়দ আহমদ শহীদ ভেরেলভী (রঃ) উল্লিখিত তরিকাসমুহ ছাড়া মুহাম্মদি তরিকার ও বয়াত নিতেন এই সফরে রামপুরে অবস্তান কালে সৈয়দ আহমদ (র) কে তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া সর্ম্পকে প্রশ্ন করা হয় । তিনি উত্তরে বলেন তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া তাৎপর্য এইঃ প্রত্যেক মানুষের প্রতিটি কাজ যেন একমাত্র আল্লাহর সন্তূষ্টি লাভের জন্য হয় । যেমন পাপ থেকে বিরত থাকার জন্যবিবাহ করা শরীয়ত সিদ্ধ নিয়মে অন্ন সংস্তানের জন্য বৈধ সম্পদ সংগ্রহ করে। নিজকে ও পরিবার বর্গকে পরমুখাপেক্ষী হইতে না দেওয়া । রাতের শেষদিকে তাহাজ্জুদ নামায ও এবাদত করার উদ্দেশ্যে প্রথম দিকে নিদ্রা যাওয়া। এভাবে জীবনের প্রতিটি কাজে একমাত্র খোদার সন্তূষ্টি লাভকেই মূল উদ্দেশ্য মনে করা কে তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া সার। অথার্ৎ চার তরিকা মুতাবিক যিকর, ফীকর, মুরাকাবা করার সাথে সাথে জীবনের সকল কর্ম। হযরাত মুহাম্মাদ মুসতাফা সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকা মুতাবিক খালিছ আল্লাহ তালা’র সন্তূষ্টি লাভের উদ্দেশে্য সম্পন্ন করার উপর প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করাই তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়ার মূল উদ্দেশ্য। সুতরাং বলা য্য় তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া' শহীদে বালাকোট হযরত সায়্যেদ আহমাদ বেরেলভী রহঃ প্রতিষ্ঠিত এক আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদর্শিক আন্দোলনের নাম। সেই সময়কার উপমহাদেশের ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওলাদে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম ইমামুত্ তরিকত, আমীরুল মু'মিনীন হযরত সায়্যেদ আহমাদ শহীদ বেরেলভী (রহঃ) পরিচালিত সংস্কার ও আযাদী আন্দোলন তিনি ছিলেন যামানার মুজাদ্দিদ তথা যুগস্রষ্টা সংস্কারক। হানাফী মাযহাবলন্বী সুন্নী আক্বিদার এই শুদ্ধপন্থী বুজুর্গ ইমামুত তরিক্বত হিসাবে ''তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া'' নামক যে মৌলিক তরিকার সূচনা করেছিলেন, তা ছিল ইমামুল হিন্দ হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দীসে দেহলভী রহঃ এর সংস্কারকর্মসূচীর বাস্তব প্রয়োগ। বিদেশী ও বিজাতীয় আধিপত্য, কুপ্রথা ও কুংস্কারের বিরুদ্ধে উপমহাদেশের মসলমানদের পুন;জাগরিত করে আজাদী আন্দোলনের পরিশীলিত গতিধারায় উদ্ধুদ্ধ করার মাধ্যমে তিনি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সিপাহসালারের ভুমিকা পালন করেছেন। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক সুবিস্তৃত অধ্যায় জুড়ে আছে এই যুগস্রষ্টা চিন্তানায়কের নাম।

Rahbaar Saheb Qiblah Fultali RA

Labbaik Labbaik Bulbul

Ki Hobe Ki Hobe Bulbul

Ja kunike Samne Urdu Gojol

bolo modina modina urdu